এই পর্বে আমরা আলোচনা করব ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে, যা বিংশ শতাব্দীর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত সংঘাত।
সময়কাল:
১ নভেম্বর ১৯৫৫ – ৩০ এপ্রিল ১৯৭৫ (বিভিন্ন উৎস অনুসারে সময়কাল ভিন্ন হতে পারে, তবে এটি সবচেয়ে প্রচলিত) ভিয়েতনাম যুদ্ধ, যা দ্বিতীয় ইন্দোচীন যুদ্ধ নামেও পরিচিত, ছিল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল সংঘাতগুলোর মধ্যে একটি। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত এই যুদ্ধ ছিল একটি আদর্শিক সংঘাতের ফল, যেখানে একদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা (দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থনকারী) এবং অন্যদিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন (উত্তর ভিয়েতনাম এবং ভিয়েত কংকে সমর্থনকারী)। এই যুদ্ধ ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়ার ইতিহাসে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে এক বিশাল বিভেদ তৈরি করে। এর ফলাফল বিশ্ব রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।

Vietnamese children running after being killed by the NAP
পটভূমি ও কারণ:
ভিয়েতনাম যুদ্ধের মূল কারণগুলো ছিল ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, ভিয়েতনামের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, স্নায়ুযুদ্ধের আদর্শিক বিভাজন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের "ডোমিনো তত্ত্ব"।

A geopolitical map of Vietnam, Laos, and Cambodia.
১. ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন এবং ইন্দোচীন যুদ্ধ
(French Colonial Rule and Indochina War):
১৯শ শতাব্দী থেকে ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়া ফরাসি উপনিবেশ ছিল, যা সম্মিলিতভাবে ফরাসি ইন্দোচীন নামে পরিচিত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের দখলের পর, ফরাসিরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু হো চি মিন-এর নেতৃত্বে ভিয়েত মিন (Viet Minh) নামক জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্ট বাহিনী ভিয়েতনামের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধই ছিল প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধ (১৯৪৬-৫৪)।

হো চি মিন
২. দিয়েন বিয়েন ফু এবং জেনেভা চুক্তি (Dien Bien Phu and Geneva Accords):
১৯৫৪ সালে দিয়েন বিয়েন ফু-তে ফরাসিদের পরাজয় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটায়। এরপর ১৯৫৪ সালের জেনেভা সম্মেলনে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে ১৭তম সমান্তরাল রেখা বরাবর উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে বিভক্ত করা হয়। এক বা দুই বছরের মধ্যে একটি জাতীয় নির্বাচন করে ভিয়েতনামকে একত্রিত করার কথা ছিল।

A historical photo of the Battle of Dien Bien Phu.
৩. স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব (Influence of the Cold War):
জেনেভা চুক্তির প্রধান শর্ত ছিল যে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার ভয় পাচ্ছিল যে, নির্বাচনে হো চি মিন-এর কমিউনিস্টরা জিতবে। স্নায়ুযুদ্ধের তীব্র সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে কমিউনিস্ট বিস্তার রোধে বদ্ধপরিকর ছিল।
৪. ডোমিনো তত্ত্ব (Domino Theory):
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার "ডোমিনো তত্ত্ব" পেশ করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, যদি একটি দেশ কমিউনিজমের কবলে পড়ে, তাহলে এর প্রতিবেশী দেশগুলোও পর্যায়ক্রমে কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকে পড়বে, অনেকটা ডোমিনো খেলার গুটির মতো। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করত যে, যদি দক্ষিণ ভিয়েতনাম কমিউনিস্টদের হাতে চলে যায়, তাহলে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে কমিউনিজম ছড়িয়ে পড়বে। এই ভয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামের অ-কমিউনিস্ট সরকারকে সমর্থন দিতে শুরু করে এবং নির্বাচনের পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়।

President Eisenhower-USA
৫. দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
(Political Instability in South Vietnam):
দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার, বিশেষ করে এনগো দিন ডিয়েমের (Ngo Dinh Diem) সরকার ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অজনপ্রিয়। তার একনায়কতান্ত্রিক শাসন এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এর ফলে দক্ষিণ ভিয়েতনামের অভ্যন্তরে কমিউনিস্ট সমর্থিত বিদ্রোহীরা, যারা ভিয়েত কং (Viet Cong) নামে পরিচিত ছিল, গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে।
৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ (U.S. Intervention):
প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি দক্ষিণ ভিয়েতনামে সামরিক উপদেষ্টার সংখ্যা বাড়ান। ১৯৬৪ সালের টঙ্কিন উপসাগরীয় ঘটনা (Gulf of Tonkin Incident) ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সামরিক হস্তক্ষেপে প্রবেশের একটি মূল মোড়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল যে, উত্তর ভিয়েতনামের টর্পেডো নৌকাগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপর আক্রমণ করেছে। এই ঘটনার পর মার্কিন কংগ্রেস 'উপসাগরীয় প্রস্তাব' (Gulf of Tonkin Resolution) পাস করে, যা প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের পূর্ণ ক্ষমতা দেয়।

যুদ্ধের সূচনা:
উপসাগরীয় প্রস্তাব পাসের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৪ সালের শেষের দিকে এবং ১৯৬৫ সালের শুরুতে উত্তর ভিয়েতনামের উপর বিমান হামলা শুরু করে (অপারেশন রোলিং থান্ডার) এবং বিপুল সংখ্যক পদাতিক সৈন্য দক্ষিণ ভিয়েতনামে পাঠায়। এর মাধ্যমে ভিয়েতনাম যুদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সংঘাতের রূপ নেয়।
যুদ্ধরত পক্ষসমূহ:
উত্তর ভিয়েতনাম এবং ভিয়েত কং (কমিউনিস্ট পক্ষ):
- উত্তর ভিয়েতনাম (Democratic Republic of Vietnam)
- নেতৃত্ব: হো চি মিন, লে দুয়ান, ফাম ভান ডং
- সামরিক নেতৃত্ব: ভো নগুয়েন জিয়াপ
- দক্ষিণ ভিয়েতনামের মুক্তি জাতীয় ফ্রন্ট (National Liberation Front - NLF), যা ভিয়েত কং নামে পরিচিত ছিল।
- চীন (সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা)
- সোভিয়েত ইউনিয়ন (সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা)
দক্ষিণ ভিয়েতনাম এবং তার মিত্ররা (অ-কমিউনিস্ট পক্ষ):
- দক্ষিণ ভিয়েতনাম (Republic of Vietnam)
- বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট, যেমন এনগো দিন ডিয়েম, নগুয়েন ভান থিউ
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
- দক্ষিণ কোরিয়া
- অস্ট্রেলিয়া
- নিউজিল্যান্ড
- থাইল্যান্ড
- ফিলিপাইন
যুদ্ধের প্রধান ঘটনাবলী ও কৌশল:
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল মূলত একটি গেরিলা যুদ্ধ এবং সীমিত আকারে প্রচলিত যুদ্ধ। এর ভূখণ্ড ছিল জঙ্গলময় ও পার্বত্য, যা গেরিলা যুদ্ধের জন্য সহায়ক ছিল।
- ১. গেরিলা যুদ্ধ এবং টানেল নেটওয়ার্ক:
ভিয়েত কং এবং উত্তর ভিয়েতনামের সৈন্যরা দক্ষিণ ভিয়েতনামের ঘন জঙ্গল এবং গ্রামবাসীদের সহায়তায় গেরিলা যুদ্ধ চালাত। তারা কু চি টানেলের মতো বিশাল টানেল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যা তাদের আশ্রয়, রসদ সরবরাহ এবং অতর্কিত আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হত।

Viet_Cong_Guerrillas_Ho_Chi_Min
- ২. মার্কিন কৌশল ও রসদ:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সামরিক শক্তি, অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং বিমান শক্তি ব্যবহার করে। তারা 'অনুসন্ধান ও ধ্বংস' (Search and Destroy) অভিযান চালাত, যেখানে সন্দেহভাজন ভিয়েত কং এলাকায় সৈন্যদের পাঠানো হত। 'এজেন্ট অরেঞ্জ' (Agent Orange) নামক বিষাক্ত ডিফলিয়েট্যান্ট ব্যবহার করা হয় জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত এবং স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ঘটায়। মার্কিন বিমানবাহিনী উত্তর ভিয়েতনামের উপর ব্যাপক বোমা হামলা চালায়, যা ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বোমা হামলার রেকর্ড ছিল।
- ৩. টেট অফেনসিভ (Tet Offensive):
১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে উত্তর ভিয়েতনাম এবং ভিয়েত কং ভিয়েতনামের নববর্ষ 'টেট'-এর সময় দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিভিন্ন শহর ও সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। যদিও সামরিকভাবে এই আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং ভিয়েত কং-এর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, এটি মার্কিন জনগণের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক হতাশা সৃষ্টি করে। টেট অফেনসিভ প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ জয়ের মার্কিন দাবি ভুল ছিল এবং যুদ্ধের সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার হয়।
- ৪. কম্বোডিয়া ও লাওসে যুদ্ধ (War in Cambodia and Laos):
উত্তর ভিয়েতনামি সৈন্যরা কম্বোডিয়া এবং লাওসের মধ্য দিয়ে 'হো চি মিন ট্রেইল' (Ho Chi Minh Trail) নামক রসদ সরবরাহ পথ ব্যবহার করত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোপনে এই পথগুলোতে বোমা হামলা চালায় এবং পরবর্তীতে কম্বোডিয়ায় স্থল অভিযান চালায়, যা যুদ্ধের বিস্তৃতি বাড়িয়ে দেয়।

- ৫. মার্কিন প্রত্যাহার ও ভিয়েতনাইজেশন
(U.S. Withdrawal and Vietnamization):
প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ক্ষমতায় এসে 'ভিয়েতনাইজেশন' নীতি গ্রহণ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা যাতে তারা মার্কিন সৈন্যদের সহায়তা ছাড়াই লড়াই করতে পারে। এর পাশাপাশি মার্কিন সৈন্যরা ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম থেকে প্রত্যাহার হতে শুরু করে।

Fall_of_Saigon_Helicopter_Evacuation_1975
- ৬. প্যারিস শান্তি চুক্তি (Paris Peace Accords):
১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে প্যারিসে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম থেকে তার সকল সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং যুদ্ধবন্দীদের বিনিময়ের ব্যবস্থা হয়। তবে, দক্ষিণ ও উত্তর ভিয়েতনামের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি।
যুদ্ধের সমাপ্তি:
প্যারিস শান্তি চুক্তির পর মার্কিন সৈন্যরা প্রত্যাহার করে নিলেও, উত্তর ভিয়েতনাম এবং ভিয়েত কং দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ চালিয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে উত্তর ভিয়েতনামের চূড়ান্ত অভিযান শুরু হয়। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনামের সৈন্যরা সাইগন (দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী) দখল করে নেয় এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে ভিয়েতনাম যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে এবং ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে একত্রিত হয়। সাইগনের নামকরণ করা হয় হো চি মিন সিটি।
ক্ষয়ক্ষতি:
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত প্রাণঘাতী এবং ধ্বংসাত্মক।
সামরিক হতাহত:
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র:
৫৮,০০০-এর বেশি সৈন্য নিহত এবং প্রায় ৩ লক্ষ আহত।

- দক্ষিণ ভিয়েতনাম: প্রায় ২,৫০,০০০ সৈন্য নিহত।
উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েত কং: আনুমানিক ১.১ মিলিয়ন সৈন্য নিহত।

War_Torn_Vietnamese_Village
বেসামরিক হতাহত:
- ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ায় প্রায় ২ মিলিয়ন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল। এর মধ্যে বোমা হামলা, যুদ্ধ এবং মাইনের শিকার বহু মানুষ ছিল।
- কম্বোডিয়ায় পল পটের খেমার রুজ শাসনের অধীনে আরও ১.৫ থেকে ২ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি:
ভিয়েতনামের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কৃষি জমি, জঙ্গল এবং অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এজেন্ট অরেঞ্জের ব্যবহার পরিবেশের উপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এবং লক্ষ লক্ষ ভিয়েতনামী নাগরিকের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল, যার মধ্যে জন্মগত ত্রুটিও অন্তর্ভুক্ত।
সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং সমাজকে গভীরভাবে বিভক্ত করে ফেলে। সৈন্যদের পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ভিয়েতনাম থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ "বোট পিপল" হিসেবে পালিয়ে যায়।

Vietnamese_Boat_People_Refugees
ফলাফল ও অর্জন:
ভিয়েতনাম যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী এবং এর অনেক অর্জন ও প্রভাব ছিল।

United_Nations_Headquarters_Entrance_Flags
- ১. ভিয়েতনামের একীকরণ (Unification of Vietnam):
যুদ্ধ শেষে ভিয়েতনাম একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে একত্রিত হয়।
- ২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বড় পরাজয়:
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম বড় সামরিক পরাজয়। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এবং নৈতিকতার উপর গভীর প্রশ্ন তোলে।
- ৩. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তন:
স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোমিনো তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়। এই যুদ্ধ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে 'ভিয়েতনাম সিন্ড্রোম' (Vietnam Syndrome) তৈরি করে, যা পরবর্তীতে সামরিক হস্তক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা বাড়িয়ে তোলে।
- ৪. যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্রভাব:
ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী এবং শান্তি আন্দোলনের নতুন প্রেরণা জোগায়। এটি গণমাধ্যম এবং জনসাধারণের মতামতের প্রভাবকেও তুলে ধরে।
- ৫. পরিবেশগত সচেতনতা:
এজেন্ট অরেঞ্জের মতো রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর এর ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়।
প্রভাব ও ভূমিকা:
ভিয়েতনাম যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘাত ছিল না, এটি ছিল একটি আদর্শিক যুদ্ধ, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করেছিল।
- গণমাধ্যমের ভূমিকা:
টেলিভিশন যুদ্ধের ভয়াবহতা সরাসরি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়, যা যুদ্ধবিরোধী মনোভাব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- সৈন্যদের মানসিক ট্রমা:
যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যরা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (PTSD) ভুগেছে, যা তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।
- ক্ষমতার ভারসাম্য:
ভিয়েতনাম যুদ্ধ স্নায়ুযুদ্ধের ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র সামরিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
- আধুনিক গেরিলা যুদ্ধ:
এই যুদ্ধ আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে একটি ছোট, সুসংগঠিত বাহিনী কীভাবে একটি বৃহৎ, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে সফল হতে পারে তা দেখানো হয়।

Vietnam_War_Impact_Poster
উপসংহার:
ভিয়েতনাম যুদ্ধ মানবজাতির ইতিহাসে এক জটিল ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। এটি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, জাতীয়তাবাদের উত্থান, এবং স্নায়ুযুদ্ধের আদর্শিক সংঘাতের এক ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরে। এই যুদ্ধ আমাদের শেখায় যে, সামরিক হস্তক্ষেপের সীমা কী হতে পারে, এবং বিদেশী ভূখণ্ডে আগ্রাসনের পরিণতি কতটা মারাত্মক হতে পারে। ভিয়েতনামের জনগণের অদম্য ইচ্ছা এবং আত্মত্যাগের গল্পও এই যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্মৃতি মানবজাতিকে শান্তির মূল্য এবং সংঘাত এড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিরন্তর স্মরণ করিয়ে দেয়। ।