
সময়কাল:
১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ – ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ, বিস্তৃত এবং প্রাণঘাতী সংঘাত ছিল, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রেশ ধরেই শুরু হয়েছিল। বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশের প্রধান শক্তিগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং এর ধ্বংসযজ্ঞ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় ৬ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮৫ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, যা মানব ইতিহাসে একক কোনো সংঘাতের সবচেয়ে বেশি হতাহতের রেকর্ড। এই যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতির ওপর এমন গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা আজও অনুভূত হয়।
পটভূমি ও কারণ:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণগুলো ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অসম্পূর্ণ সমাধান, ভার্সাই চুক্তির কঠোরতা, ১৯২৯ সালের মহামন্দা, ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা।

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অসম্পূর্ণ মীমাংসা ও ভার্সাই চুক্তি (Unresolved Issues of WWI & Treaty of Versailles):
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির উপর চাপানো ভার্সাই চুক্তি (১৯১৯) ছিল অত্যন্ত কঠোর। জার্মানিকে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়, সামরিক শক্তি সীমিত করা হয়, এবং আলসাস-লরেনসহ অন্যান্য ভূখণ্ড হারাতে হয়। এই অপমানজনক চুক্তি জার্মান জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। এই ক্ষোভই পরবর্তীতে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টির উত্থানের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতা (Failure of the League of Nations):
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখার জন্য গঠিত জাতিপুঞ্জ (League of Nations) তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। ইতালির ইথিওপিয়া আক্রমণ (১৯৩৫), জাপানের মাঞ্চুরিয়া দখল (১৯৩১) এবং জার্মানির রাইনল্যান্ড পুনর্দখল (১৯৩৬) এর মতো আগ্রাসনগুলোকে জাতিপুঞ্জ কার্যকরভাবে থামাতে পারেনি। এর দুর্বলতা আগ্রাসী দেশগুলোকে আরও দুঃসাহসী করে তোলে।
৩. ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ-এর উত্থান (Rise of Fascism and Nazism):
ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী দল এবং জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি পার্টির উত্থান বিশ্ব শান্তির জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই স্বৈরাচারী শাসনগুলো আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণবাদের নীতি গ্রহণ করে। হিটলার "লেবেনস্রাউম" (Lebensraum) বা জীবনধারণের স্থান সম্প্রসারণের অজুহাতে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো দখলের পরিকল্পনা করেন।

Images of Adolf Hitler, Benito Mussolini, and Emperor Hirohito
৪. জাপানি সাম্রাজ্যবাদ (Japanese Imperialism):
পূর্ব এশিয়ায় জাপান একটি উদীয়মান শক্তি ছিল এবং তারা "বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া সহ-সমৃদ্ধি অঞ্চল" (Greater East Asia Co-Prosperity Sphere) গঠনের নামে চীনের বিশাল অংশ এবং অন্যান্য এশীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। ১৯৩০-এর দশক জুড়ে জাপানের আগ্রাসী নীতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
৫. মহামন্দার প্রভাব (Impact of the Great Depression):
১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে গভীর সংকট তৈরি করে। জার্মানির অর্থনৈতিক পতন চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্ব সৃষ্টি করে, যা হিটলারের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতাদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে তোলে। জনগণের হতাশা এবং অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ফ্যাসিবাদী আদর্শকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল।
৬. তুষ্টিকরণ নীতি (Appeasement Policy):
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা শক্তিগুলো জার্মানির আগ্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রাথমিকভাবে তুষ্টিকরণ নীতি দ্বারা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। ১৯৩৮ সালে মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে জার্মানিকে চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড অঞ্চল দখলে সম্মতি দেওয়া হয় এই আশায় যে, এতে হিটলারের আকাঙ্ক্ষা মিটবে এবং যুদ্ধ এড়ানো যাবে। কিন্তু এই নীতি হিটলারকে আরও বেপরোয়া করে তোলে।

Images from the Munich Agreement (Chamberlain, Hitler).
৭. অস্ট্রিয়া এবং চেকোস্লোভাকিয়া দখল (Anschluss and Occupation of Czechoslovakia):
১৯৩৮ সালে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সাথে যুক্ত করে (Anschluss)। এরপর ১৯৩৯ সালের মার্চ মাসে হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার বাকি অংশ দখল করে নেন, যা মিউনিখ চুক্তির লঙ্ঘন ছিল। এই ঘটনাগুলো পশ্চিমা দেশগুলোকে জার্মানির আগ্রাসী উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক করে তোলে।
৮. মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি (Molotov-Ribbentrop Pact):
১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অনাক্রমণ চুক্তি (Non-Aggression Pact) স্বাক্ষর করে, যা মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তিতে পূর্ব ইউরোপ, বিশেষ করে পোল্যান্ডকে উভয় দেশের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার একটি গোপন প্রোটোকলও ছিল। এই চুক্তি হিটলারকে পশ্চিমা ফ্রন্টে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দেয়।
যুদ্ধের সূচনা: মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি স্বাক্ষরের এক সপ্তাহ পর, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। জার্মানির "ব্লিৎসক্রিগ" (Blitzkrieg) বা "বজ্রযুদ্ধ" কৌশল ব্যবহার করে দ্রুত পোল্যান্ডের বেশিরভাগ অংশ দখল করে নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব দিক থেকে পোল্যান্ড আক্রমণ করে, চুক্তির গোপন শর্ত অনুযায়ী পোল্যান্ডকে ভাগ করে নেয়।
যুদ্ধরত পক্ষসমূহ:
অক্ষশক্তির দেশসমূহ (Axis Powers):
- জার্মানি (নেতা: অ্যাডলফ হিটলার)
- ইতালি (নেতা: বেনিতো মুসোলিনি)
- জাপান (নেতা: সম্রাট হিরোহিতো, প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজো)
- এবং তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলো (যেমন হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, থাইল্যান্ড)।
মিত্রশক্তির দেশসমূহ (Allied Powers):
- যুক্তরাজ্য (নেতা: উইনস্টন চার্চিল)
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (নেতা: ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট, পরে হ্যারি এস. ট্রুম্যান)
- সোভিয়েত ইউনিয়ন (নেতা: জোসেফ স্টালিন)
- ফ্রান্স (প্রাথমিকভাবে, পরে ভিশি ফ্রান্স এবং ফ্রি ফ্রান্স)
- চীন
- কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পোল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড এবং অন্যান্য অসংখ্য দেশ।
যুদ্ধের প্রধান ঘটনাবলী ও কৌশল:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রধানত ইউরোপীয় ফ্রন্ট, উত্তর আফ্রিকান ফ্রন্ট, এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফ্রন্টে সংঘটিত হয়েছিল।
১. ইউরোপীয় ফ্রন্ট:
- পোল্যান্ডের পতন (Fall of Poland):
১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে ব্লিৎসক্রিগ কৌশলে জার্মানির পোল্যান্ড দখল। *
- ফ্রান্সের পতন (Fall of France):
১৯৪০ সালের মে-জুনে জার্মানি ফ্রান্স আক্রমণ করে এবং দ্রুত প্যারিস দখল করে নেয়। ফ্রান্সের পতন ছিল মিত্রশক্তির জন্য একটি বড় ধাক্কা।
ব্যাটল অফ ব্রিটেন (Battle of Britain):
১৯৪০ সালের গ্রীষ্মকালে জার্মান বিমানবাহিনী (লুফটওয়াফে) যুক্তরাজ্যের উপর ব্যাপক বিমান হামলা চালায়, কিন্তু ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF) তাদের প্রতিহত করে। এটি ছিল জার্মানদের প্রথম বড় পরাজয়।
অপারেশন বারবারোসা (Operation Barbarossa):
১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেন, যা ছিল জার্মান-সোভিয়েত অনাক্রমণ চুক্তির লঙ্ঘন। এই বিশাল আক্রমণ পূর্বা ফ্রন্টে ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা করে। স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধ (১৯৪২-৪৩) ছিল এই ফ্রন্টের একটি টার্নিং পয়েন্ট, যেখানে জার্মান বাহিনী পরাজিত হয়।

Photos of the ruins of the Battle of Stalingrad
ডি-ডে (D-Day):
৬ জুন ১৯৪৪ সালে মিত্রশক্তি নরম্যান্ডিতে (ফ্রান্স) অবতরণ করে, যা ছিল পশ্চিমা ফ্রন্টে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার একটি বিশাল সামরিক অভিযান। এই অভিযান জার্মানির পরাজয়ের পথ প্রশস্ত করে।

Historical photos of the D-Day landings
বার্লিনের পতন (Fall of Berlin):
১৯৪৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে সোভিয়েত সৈন্যরা বার্লিন দখল করে নেয়। ৩০ এপ্রিল হিটলার আত্মহত্যা করেন এবং ৭ মে জার্মানি শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করে, যা ইউরোপে যুদ্ধের অবসান ঘটায়।
২. আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় ফ্রন্ট:
মুসোলিনির ইতালি উত্তর আফ্রিকা এবং ভূমধ্যসাগরে সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করে। ব্রিটিশ এবং কমনওয়েলথ বাহিনী ইতালীয় ও জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। ১৯৪২ সালের আল-আলামিনের যুদ্ধ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়, যা মিত্রশক্তিকে উত্তর আফ্রিকা থেকে অক্ষশক্তিকে বিতাড়িত করতে সাহায্য করে।
৩. প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফ্রন্ট:
পার্ল হারবার আক্রমণ (Attack on Pearl Harbor):
৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে জাপান হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে মার্কিন নৌ ঘাঁটিতে অতর্কিত হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে।
মিডওয়ে যুদ্ধ (Battle of Midway):
১৯৪২ সালের জুনে এই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নৌবাহিনীকে পরাজিত করে, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধে একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল।

Photos of the fleet at the Battle of Midway
দ্বীপ থেকে দ্বীপে যুদ্ধ (Island Hopping):
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের দখলকৃত দ্বীপগুলো একটি একটি করে পুনরুদ্ধার করার কৌশল গ্রহণ করে। ইও জিমা এবং ওকিনাওয়ার যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী।
পারমাণবিক বোমা হামলা (Atomic Bombings):
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা (৬ আগস্ট) এবং নাগাসাকিতে (৯ আগস্ট) দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলে। এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
হলোকাস্ট (The Holocaust):
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি দ্বারা পরিচালিত হলোকাস্ট ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যা। হিটলারের "চূড়ান্ত সমাধান" (Final Solution) নীতির অধীনে প্রায় ৬ মিলিয়ন ইহুদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ইহুদিদের পাশাপাশি রোমা, সমকামী, প্রতিবন্ধী এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদেরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ও এক্সটারমিনেশন ক্যাম্পগুলোতে (যেমন আউশভিৎস, ট্রেবলিঙ্কা) গ্যাস চেম্বার এবং অন্যান্য উপায়ে হত্যা করা হয়। এটি মানব ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
ক্ষয়ক্ষতি:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অকল্পনীয়।
- সামরিক হতাহত:
প্রায় ১৫ থেকে ২৫ মিলিয়ন সৈন্য যুদ্ধে মারা গিয়েছিল। এর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্যরাই ছিল সর্বোচ্চ, প্রায় ৮-১০ মিলিয়ন। *
- বেসামরিক হতাহত:
আনুমানিক ৫০ থেকে ৫৫ মিলিয়ন বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছিল, যার মধ্যে হলোকাস্টের শিকার ৬ মিলিয়ন ইহুদিও অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষ, রোগ এবং নির্বিচার বোমা হামলায় বহু মানুষ প্রাণ হারায়। চীনের প্রায় ১০-২০ মিলিয়ন বেসামরিক মানুষ জাপানি আগ্রাসনের শিকার হয়।

Photos of the aftermath of the atomic bombings of Hiroshima or Nagasaki. and a historical photo of the surrender of Japan
অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি:
ইউরোপ এবং এশিয়ার বিশাল অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। শহর, শিল্প কারখানা, অবকাঠামো এবং কৃষি জমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় ২৫-৩০% অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছিল। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ছিল ট্রিলিয়ন ডলারের সমতুল্য।
সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি:
অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জন হারায়, এবং লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়। যুদ্ধের মানসিক আঘাত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে গেছে।
ফলাফল ও অর্জন:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বকে সম্পূর্ণভাবে নতুন আঙ্গিকে রূপ দেয়।
১. জাতিসংঘের সৃষ্টি (Creation of the United Nations):
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য এবং ভবিষ্যতে এমন ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ (UN) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি জাতিপুঞ্জের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়।

২. স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা (Beginning of the Cold War):
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দুটি পরাশক্তির উত্থান হয়। তাদের ভিন্ন মতাদর্শ (গণতন্ত্র বনাম কমিউনিজম) এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দেয়, যা প্রায় ৪০ বছর ধরে বিশ্বকে প্রভাবিত করে।
৩. উপনিবেশবাদের অবসান (End of Colonialism):
ইউরোপীয় শক্তিগুলো যুদ্ধে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তারা তাদের উপনিবেশগুলো ধরে রাখতে পারেনি। ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে, যা বিশ্ব মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে।
৪. জার্মানি ও কোরিয়ার বিভাজন (Division of Germany and Korea):
জার্মানি পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানিতে বিভক্ত হয়ে যায় এবং কোরিয়াও উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াতে বিভক্ত হয়, যা স্নায়ুযুদ্ধের একটি প্রতীক ছিল।
৫. প্রযুক্তির অগ্রগতি:
যুদ্ধের প্রয়োজনে অনেক নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়, যেমন জেট ইঞ্জিন, রাডার, কম্পিউটার এবং পারমাণবিক শক্তি।
৬. আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার (International Law and Human Rights):
হলোকাস্ট এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ধারণা আরও শক্তিশালী হয়। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়।
প্রভাব ও ভূমিকা:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবজাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এর প্রভাব এতটাই গভীর যে, আজও আমরা এর ফল ভোগ করছি।
- বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন:
এটি একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দেয়, যেখানে দুটি পরাশক্তি এবং তাদের প্রভাবাধীন ব্লক গঠিত হয়। *
- গণহত্যার ভয়াবহতা:
হলোকাস্টের মতো ঘটনা মানবজাতির বিবেককে নাড়া দেয় এবং জাতিগত নির্মূলের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
- পারমাণবিক যুগের সূচনা:
পারমাণবিক বোমার ব্যবহার মানবজাতিকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করায়, যেখানে ব্যাপক ধ্বংসের ক্ষমতা মানুষের হাতে চলে আসে।
- আর্কিটেকচার ও সংস্কৃতি:
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং পুনর্গঠন স্থাপত্য ও শহুরে পরিকল্পনায় নতুন ধারার জন্ম দেয়। যুদ্ধোত্তর শিল্পকলা, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র যুদ্ধের ভয়াবহতাকে প্রতিফলিত করে।
উপসংহার:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবজাতির জন্য এক বেদনাদায়ক শিক্ষা এবং একটি কঠিন সতর্কতা। এটি কেবল সামরিক সংঘাত ছিল না, বরং মানবতার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক ভয়াবহ অপরাধের চিত্রও তুলে ধরে। এই যুদ্ধ স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা এবং আগ্রাসন কত সহজে বিশ্বকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের শিখায় যে, শান্তি, সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা জরুরি। এই স্মারকটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে উদ্বুদ্ধ করবে।